Saturday, May 16, 2020


‌উইলহেম স্টেইনিৎজ শুধু প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নন, দাবার একজন গ্রেট গবেষকও। স্টেইনিৎজের সময় থেকেই দাবার আধুনিক যুগ শুরু।



আর্থিক অনটন!‌ উন্মাদ!‌
আধুনিক দাবার জনকের
শেষ জীবনটা ভাল কাটেনি


নির্মলকুমার সাহা


এখন তিন-‌সাড়ে তিন বছর বয়সেও দাবা বোর্ডের সামনে বসে পড়ছে শিশুরা। শুধু ঘুঁটি নাড়াচাড়াই নয়, ওই বয়সেই খেলছে প্রতিযোগিতায়ও। কিন্তু তিনি দাবা শুরু করেছিলেন ১২ বছর বয়সে, এখন যে বয়সে অনেকে পৌঁছে যাচ্ছে গ্র‌্যান্ড মাস্টার হওয়ার দরজায়। এত ‘‌দেরি’-‌তে দাবা খেলা শুরু করে অবশ্য তাঁর বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। দাবা ইতিহাসের পাতায় ঊজ্জ্বল হয়েই আছেন উইলহেম স্টেইনিৎজ। তিনিই দাবার প্রথম সরকারি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ১২ বছর বয়সে দাবা শুরু করলেও গুরুত্ব দেওয়া শুরু আরও অনেক পরে। জন্মস্থান (‌জন্ম ১৭ মে, ১৮৩৬)‌ প্রাগ ছেড়ে লেখাপড়ার জন্য ভিয়েনায় এসেই তিনি দাবা খেলাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। বয়স তখন ২০ পেরিয়ে গিয়েছে। অঙ্কের ভাল ছাত্র ছিলেন স্টেইনিৎজ। ম্যাথমেটিক্স নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্যই তাঁর ভিয়েনায় যাওয়া। কিন্তু অঙ্ক নয়, সেখানে গিয়ে বেশি মেতে ওঠেন দাবা নিয়ে। ১৮৫৯ সালে ভিয়েনা চেস চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় হন। ১৮৬১-‌তে চ্যাম্পিয়ন। ৩১ খেলায় ৩০ পয়েন্ট। তখনই তাঁকে ‘‌দ্য অস্ট্রিয়ান মরফি’‌ নামে ডাকা শুরু। ১৮৬২ সালে অস্ট্রিয়া দলের হয়ে লন্ডনে খেলতে যান। সেখানে তাঁর খেলা উচ্চ প্রশংসিত হয়। এবং তিনি পেশাদার দাবা খেলোয়াড় হয়ে থেকে যান সেখানেই। দাবা ইতিহাসে তিনিই প্রথম ঘোষিত পেশাদার খেলোয়াড়। তারপর অ্যাপিয়ারেন্স মানি ছাড়া তিনি কখনও কোথাও খেলেননি। উইলহেম স্টেইনিৎজকে বলা হয় ‘‌আধুনিক দাবার জনক’‌। আজ জন্মদিনে আধুনিক দাবার জনককে একটু ফিরে দেখা।
স্টেইনিৎজের আগে ফিলোডর, পল মরফি, অ্যান্ডারসন, স্টনটনের মতো নামী দাবাড়ুরা থাকলেও কেউই সরকারিভাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ছিলেন না। সরকারিভাবে দাবার প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের খেলা হয় ১৮৮৬ সালে। আমেরিকার তিনটি শহরে পর্যায়ক্রমে খেলা হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক, সেন্ট লুই এবং নিউ ওরলিনস। সেই খেতাবি লড়াইয়ে স্টেইনিৎজের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জোহানেস জুকার্টট। ঠিক হয়েছিল প্রথম যিনি ১০টি গেম জিতবেন, তিনিই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবেন। প্রথম পাঁচটি গেমের শেষে জুকার্টট ৪-‌১ এগিয়ে যান। প্রায় সবাই নিশ্চিত হয়ে যান জুকার্টটই প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চলেছেন, তখনই ঘুরে দাঁড়ান স্টেইনিৎজ। জেতেন ১২.‌৫-‌৭.‌৫ পয়েন্টে। জয় ১০, ড্র ৫, হার ৫। অস্ট্রিয়ার স্টেইনিৎজ তখন আমেরিকায় থাকলেও সেদেশের নাগরিকত্ব ছিল না। কিন্তু ওই খেতাবি লড়াই শুরুর আগে তিনি দাবি জানান, বোর্ডে তাঁর সামনে রাখতে দিতে হবে আমেরিকার পতাকা। এই নিয়ে অনেকটা জল ঘোলা হয়। পরে ১৮৮৮ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব পান এবং উইলহেম নাম বদলে হন উইলিয়াম।
১৮৮৬ থেকে ১৮৯৪ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ছিলেন স্টেইনিৎজ। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া ও খেতাব হারানোর মাঝে তাঁকে আরও তিনবার খেতাব রক্ষার লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। প্রথমে হাভানায় ১৮৮৯ সালে। সেবার স্টেইনিৎজের চ্যালেঞ্জার ছিলেন রাশিয়ার মিখাইল চিগোরিন। এটা ঠিক খেতাব রক্ষার লড়াই ছিল কি না, তা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। কারণ তখনও ফিডের (‌আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা)‌ জন্ম হয়নি। এত নিয়মকানুনও ছিল না। কে চ্যালেঞ্জার হবেন, সেটা অনেকটাই নির্ভর করত আগের বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ওপর। তিনি সম্মতি না জানালে ওই খেলা হত না। চিগোরিনকে চ্যালেঞ্জার হিসেবে স্টেইনিৎজ মেনে নিয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে সেই লড়াইয়ে স্টেইনিৎজ জিতে (‌জয় ১০, ড্র ১, হার ৬)‌ যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে আর বিতর্ক জমে থাকেনি।
১৮৯০-‌৯১ সালে স্টেইনিৎজ দ্বিতীয়বার খেতাব রক্ষার লড়াইয়ে নামেন নিউ ইয়র্কে ইসিডোর গুন্সবার্গের বিরুদ্ধে। বেস্ট অফ ২০ গেমের সেই লড়াইয়ে জিতে (‌জয় ৬, হার ৪, ড্র ৯)‌ স্টেইনিৎজ বিশ্ব খেতাব ধরে রাখেন। ‌‌
১৮৯২ সালে হাভানাতে আবার চিগোরিনের মুখোমুখি হন। এটাও ছিল বেস্ট অফ ২০ গেমের লড়াই। তাতে মীমাংসা না হলে টাইব্রেক। ২০ গেমের সেই লড়াই অমীমাংসিত ছিল। উভয়েই জিতেছিলেন ৮টি করে গেম। চারটি ড্র। টাইব্রেকে দুটিতে জয় স্টেইনিৎজের, একটি ড্র। ফলে বিশ্ব খেতাব স্টেইনিৎজের দখলেই থেকে যায়।
শেষ পর্যন্ত ১৮৯৪ সালে জার্মানির এমানুয়েল লাসকারের কাছে বিশ্ব খেতাব হারান স্টেইনিৎজ। সেবার খেলা হয়েছিল তিনটি শহরে। নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া ও মন্ট্রিল। ঠিক বেস্ট অফ ২০ নয়, নিয়ম করা হয়েছিল যিনি ১০টি গেম প্রথম জিতবেন, তিনিই হবেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। লাসকারের পক্ষে ফল ছিল জয় ১০, হার ৫, ড্র ৪। এমানুয়েল লাসকার খেতাব কেড়ে নেওয়ার পর ১৮৯৬-‌৯৭ সালে চ্যালেঞ্জার হয়েছিলেন স্টেইনিৎজ। কিন্তু সেবারও পারেননি। ওই একই নিয়মে লাসকার খেতাব দখলে রেখেছিলেন। ফল ছিল লাসকারের পক্ষে জয় ১০, হার ২, ড্র ৫। সেই শেষ। বিশ্ব খেতাবের লড়াইয়ে স্টেইনিৎজকে আর দেখা যায়নি।
সবাই বলেন, লেখাপড়ার সঙ্গে দাবা খেলার কোনও বিরোধ নেই। এই বক্তব্যের পক্ষে দেখা যায়, সেরা দাবাড়ুরা প্রায় সবাই লেখাপড়ায় খুব ভাল। ব্যতিক্রম ছিলেন না স্টেইনিৎজও। শুধু খেলোয়াড় নয়, দাবা লেখক হিসেবেও তিনি পৌঁছেছিলেন অন্য উচ্চতায়। ১৮৭২ থেকে ১৮৮২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন লন্ডনের ‘‌দ্য ফিল্ড’‌ পত্রিকার দাবা প্রতিবেদক। শুধু খেলার চুলচেরা বিশ্লেষণই নয়, দাবা নিয়ে লিখতেন নানা স্বাদের লেখা। ১৮৮৫ সালে তাঁর হাত ধরেই প্রকাশিত হয় ‘‌ইন্টারন্যাশনাল চেস ম্যাগাজিন’‌। তিনিই প্রতিষ্ঠাতা-‌সম্পাদক। ১৮৯১ পর্যন্ত তিনি সম্পাদক ছিলেন। সিরিয়াস দাবা খেলা শুরুর অল্প পরেই তাঁকে সবাই বলতেন, ‘‌দ্য অস্ট্রিয়ান মরফি’‌। ১৮৯৪ সালে মরফি মারা যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ সিরিজ লিখেছিলেন স্টেইনিৎজ। ‘‌দ্য মডার্ন চেস ইনস্ট্রাক্টর’‌-‌এর মতো অতি প্রয়োজনীয় বইও ভবিষ্যতের দাবা খেলোয়াড়দের জন্য লিখে গিয়েছেন তিনি।
গ্যারি কাসপারভ '‌My Great Predecessors'‌ ‌বইয়ে লিখেছেন, ‘‌উইলহেম স্টেইনিৎজ শুধু প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নন, তিনি দাবার একজন গ্রেট গবেষকও।’‌ কাসপারভের মতে, স্টেইনিৎজের সময় থেকেই দাবার আধুনিক যুগ শুরু। ১৮৭৩ সালে ভিয়েনাতে এক প্রতিযোগিতায় ‘‌পজিশনাল প্লে’‌-‌র এক নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে যা আধুনিক দাবার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। তাঁকে অনেকে বলেন ‘‌দাবার বিজ্ঞানী’‌।
১৮৯৯ সালের জুন মাস। ৬৩ বছর বয়সে ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন লন্ডনে। দারিদ্র‌্য তখন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী। যা তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীনও করে তুলেছিল। লন্ডনে জীবনের সেই শেষ প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেলেন না। ব্যর্থ হলেন আর্থিক পুরস্কার জিততে। আগের ৪০ বছরে যা আর কখনও হয়নি। ওই ব্যর্থতা মেনে নিতে পারেননি। তিনি প্রায় উন্মাদ হয়ে যান। মানসিক নানা হাসপাতালে চিকিৎসায়ও কোনও ফল পাওয়া যায়নি। মারা যান ১৯০০ সালের ১২ আগস্ট।
স্টেইনিৎজই দাবা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়, যিনি অ্যাপিয়ারেন্স ফি ছাড়া কোনও প্রতিযোগিতায় খেলতেন না। তবু দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই দাবা খেলোয়াড়ের শেষ জীবনও কেটেছে প্রবল দারিদ্র‌্যের মধ্যেই। শেষ বয়সে তিনি বলতেন, ‘‌খ্যাতি, জনপ্রিয়তা অনেক পেয়েছি। আর দরকার নেই। এখন আমার প্রয়োজন অর্থ।’‌
দাবা বোর্ডে নিত্যনতুন চাল বের করতে তাঁর মস্তিস্ক যতটা সচল ছিল, অর্থ জমানোর ক্ষেত্রে তা ছিল না।

জন্ম:‌ ১৭ মে, ১৮৩৬।
মৃত্যু:‌ ১২ আগস্ট, ১৯০০। 

No comments:

Post a Comment

‌ ভারতের ঘরে অলিম্পিক হকির আরেকটা পদক দেখে যেতে পারলেন না। জীবনের দৌড়েও হেরে গেলেন বলবীর সিং। ‘‌সেঞ্চুরি’‌-‌ও আর হল না। ‘‌আনলাকি’‌ নয়,...